|
|

শরত্চন্দ্র তাঁর অমন পাকাপোক্ত কলমটি যে আসলে উত্তরাধিকারসূত্রে পিতার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন, সেকথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন: “...পিতার দ্বিতীয়গুণের ফলে জীবন ভ’রে আমি কেবল স্বপ্ন দেখেই গেলাম। আমার পিতার পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা এক কথায় সাহিত্যের সরল বিভাগেই তিনি হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনওটাই তিনি শেষ করতে পারেন নি।” ওই শেষ না করা মতিলাল চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য-সম্ভার শরতবাবু কেমন করে সাহিত্যচর্চায় টেনে আনে, অতঃপর সেই ইতিবৃত্ত: “অসমাপ্ত অংশগুলি কী হতে পারে, ভাবতে ভাবতে আমার অনেক বিনিদ্র রজনী কেটে গেছে। এই কারণেই বোধহয়, সতের বত্সর বয়সের সময় আমি গল্প লিখতে শুরু করি।” তখন শরত্চন্দ দেবানন্দপুরে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলের ছাত্র। তাঁর জীবনীর ওই অংশে “তিনি ‘কাকবাসা’ ও ‘ব্রহ্মদৈত্য’ নামক দুইটি গল্প (দুইটিই নিখোঁজ) লেখেন এবং ‘কাশীনাথ’ গল্পের মূল আখ্যান ভাগও লিখিতে আরম্ভ করেন।” দেবানন্দপুরের পর শরত্চন্দ্রের হাতে কলম দেখা যাচ্ছে ভাগলপুরে। দু’-বছর পরে। তাঁর নেতৃত্তেই ইন্দুভূষণ-বিভূতিভূষণ ভট্টদের খঞ্জরপুর পল্লীর বাড়িতে গড়ে উঠল সাহিত্যসভা। বেরুল হাতে লেখা পত্রিকা ‘ছায়া’। তাতে শরত্চন্দ্র লিখলেন একটি গল্প, ‘আলো ও ছায়া’ এবং একটি প্রবন্ধ, ‘ক্ষুদ্রের গৌরব’। কিন্তু সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় যে-স্মৃতিচারণ করেছেন, “শরত্চন্দ্র ওই সময় বিভূতিভূষণ ভট্টদের বাড়িতে সকালে, দুপুরে, সন্ধ্যায় একটা রিজার্ভ-করা চেয়ারে বসে মোটা মোটা ইংরেজি বই পড়তেন এবং অনর্গল গল্প লিখতেন” কোথায় গেল সেইসব ‘অনর্গল গল্প’? অন্য কয়েকটি স্মৃতিকথায় হদিস পাওয়া যাচ্ছে কিছু: কেউ এক বৃহদায়তন খাতায় দেখেছেন ‘অভিমান’ নামে একটি উপাখ্যান অথবা গল্পের খাতায় “বোঝা, অনুপমার প্রেম, বামুনঠাকুর আর একটি কী তা মনে নেই।” আবার কোনও খাতায় “ ‘কোরেল’ নাম দেওয়া একটি গল্প ও একটি ইংরাজি নামধামওয়ালা (সম্ভবত অনুবাদই) মারী কোলেরীল ‘মাইটি অ্যাটম’-এর অনুবাদ।” কিক্তু ১৯০৩ সালে রেঙ্গুন যাত্রার পূর্বমুহূর্তে তিনি পাকা করে যান বাংলা সাহিত্যে নিজের আসনটি। মাতুল সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন ঘটনাটি: “রেঙ্গুন যাওয়ার আগের দিন তিনি আমাদের বাসায় যান।... পরে আমাকে সঙ্গে নিয়ে পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরদের বাড়িযাচ্ছি বলে পথে গিয়ে বলেন যে, ‘কুন্তলীন পুরস্কারের’ জন্য আমার
নামে একটি গল্প দিয়ে গেছেন ‘মন্দির’ নাম দিয়ে। গল্পের প্লট বলেন, এবং বলেন, প্রাইজ পেলে মোহিত সেন প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের কাব্য-গ্রন্থাবলী যেন তাঁকে দেওয়া হয়।” সে বছর কুক্তলীন-প্রতিযোগিতার বিচারক জলধর সেন পরে লিখেছিলেন: “প্রায় দেড়শত গল্প এসেছিল, তার মধ্যে মন্দির গল্পটি আমার সব চাইতে ভাল লেগেছিল। মনে আছে এই গল্পটির উপর ছোট একটু মক্তব্য লিখেছিলাম এই লেখক যদি চর্চা রাখেন, তা হলে ভবিষ্যতে যশস্বী হবেন।” শরত্সাহিত্যর জনপ্রিয়তা গোটা দেশে কতদূর বিস্তৃত তা ‘আনন্দ’ প্রথম উপলব্ধি করে তাঁর রচনাবলী প্রকাশ করতে গিয়ে। ১৯৮৫-তে দেশের সর্বত্র ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সর্বমোট ১১০টি শাখার মাধ্যমে গ্রাহকভুক্তির সময় শরত্অনুরাগীদের পরিসংখ্যান সত্যিই চমক জাগানো! শরত্-প্রিয়তার এই বিষয়টি গোচরে আসে সংবাদপত্রেও। শরত্ রচনাবলী বাবদ যে-বিরাট অঙ্কের অর্থমূল্য রয়্যালটি দিয়েছিল ‘আনন্দ’, ইন্ডিয়া টুডে তাকে এদেশের ‘দ্য বিগেস্ট সিঙ্গল রয়্যালটি ডিল’ আখ্যা দেয়। প্রকাশের পর থেকে প্রতি দশকেই তাঁর রচনাবলীর চাহিদা ক্রমবর্ধমান। হিসেবে দশক পিছু প্রায় চল্লিশ হাজার। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে, লেখকের জন্মমাসে বিশেষ ছাড়ে তাঁর রচনাবলীর সুলভ ও রাজ সংস্করণ এবং আলাদা প্রকাশিত ‘শ্রীকান্ত’ ছাড়া গোপালচন্দ্র রায়ের লেখা জীবনীগ্রন্থ ‘শরত্চন্দ্র’ আর ‘শরত্চন্দ্রের বৈঠকি গল্প’ বইগুলি পরিবেশনের আয়োজন করে ‘আনন্দ’।
|
|